শিশু – যুব সমাজকে অপসংস্কৃতির জোয়ার থেকে সুস্থ সংস্কৃতির জোয়ারে তুলে আনতে দেবদূতের ভূমিকায় ‘ বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব ‘ অভিজিৎ হাজরা,

বাগনান, হাওড়া :- বর্তমানে দেশব্যাপী সংস্কৃতির দু ‘ টো জোয়ার বইছে। একদিকে বইছে অপসংস্কৃতির জোয়ার, অন্যদিকে বইছে সুস্থ সংস্কৃতির জোয়ার। দু ‘ ই জোয়ারের মধ্যে অপসংস্কৃতির জোয়ারের গতিবেগ বেশি।দেশ যত এগিয়ে চলেছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিশু থেকে যুবসমাজ মোবাইল,পণ্যগ্ৰাফী সহ অন্যান্য বিনোদনমূলক (অপসংস্কৃতি -তে) আসক্ত হয়ে পড়ছে। অত্যাধিক সময়ে মোবাইলে ডুবে থাকায় শিশু থেকে যুবসমাজের মস্তিষ্কের কোনো কিছুর ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। নানান দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। নিজেদের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা আছে, সেই প্রতিভাকে বিকশিত করতে পাচ্ছে না। অপসংস্কৃতির জোয়ারে ভেসে যাওয়া শিশু থেকে যুবসমাজের কাছে খড় – কুটোর মতো ভেসে গিয়ে তাদের অপসংস্কৃতির জোয়ার থেকে উদ্ধার করে সুস্থ সংস্কৃতির জোয়ারে ভাসানোর জন্য নাটক – কে হাতিয়ার করেছে বাগনান থানার বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব। এই ক্লাব ২৪ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নাট্য উৎসব এর আয়োজন করে চলেছে।

বিদ্যালয়ের ছাত্র -ছাত্রীদের মধ্যে নাট্য চর্চা ও নাট্যের প্রসার ঘটানোর জন্য দু ‘ ই বৎসর যাবৎ বিদ্যালয় ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করার পাশাপাশি ২৪ বৎসর যাবৎ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের নাট্যদল গুলিকে নিয়ে নাট্য প্রদর্শনীর আয়োজন করে চলেছে। বিলুপ্ত হতে বসা নাট্য শিল্পের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে গ্ৰামীণ হাওড়া জেলার বাগনান থানার অন্তর্গত স্বাধীনতা সংগ্রামের পীঠস্থান ’ বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব ‘ এর উদ্যোগে তিনদিন ব্যাপী ২৪ তম নাট্য উৎসব এবং ২ য় বর্ষ স্কুল ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা ২০২৬ অনুষ্ঠিত হল বাঙালপুর সিংহবাহিনী তলায় বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব প্রাঙ্গণে। ২৪ তম নাট্য উৎসব এবং ২ য় বর্ষ স্কুল ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব এর সম্পাদক তপন ঘোষ বলেন, ” বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব আজম্ম গৌরব ও মাহাত্ম্যে অন্যান্য ক্লাব গুলি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই ক্লাব তৈরি হয়েছিল ১৯৩৩ খ্রীঃ। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের একটি ক্লাবের নাম ‘ বয়েজ ক্লাব ‘ , দেখে এবং তাদের কর্মধারায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে তৎকালীন সময়ে এই এলাকার ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ এই ক্লাবের নামকরণ করেছিলেন ” বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব ” ।
প্রতিষ্ঠাতাগণের সম্মানার্থে ক্লাবের নাম পরিবর্তন করা হয় নি। এই ক্লাব সাহিত্য – সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাগনান থানার মধ্যে বলা যায় শীর্ষ স্থানীয় ক্লাব।২৬ বৎসর আগে এই এলাকার মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য নাট্য উৎসব এবং নাট্য প্রতিযোগিতার সূচনা হয়েছিল। নাট্যের প্রসার, এলাকার শিশু, যুবক – যুবতীদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানো, নাটকের প্রতি যুব সম্প্রদায়ের উৎসাহ বৃদ্ধি ঘটানো, অভিনয়ের প্রতি যুব সমাজকে উৎসাহিত করার জন্য এই নাট্য উৎসব এবং নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন। বিগত দিনে নাট্য প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আমরা নানান অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছি। অভিনয়ের দিনে নাট্যদল গুলি নানান অজুহাত দেখিয়ে অভিনয় করতে আসতো না। এই পরিস্থিতিতে আমরা পরবর্তী সময়ে নাট্য প্রতিযোগিতা করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে প্রদশর্নীমূলক নাট্য উৎসব করার মনস্থির করে প্রদর্শনীমূলক নাট্য উৎসব করে চলেছি।২০২৫ সাল থেকে আমরা নাট্য উৎসবের পাশাপাশি বাগনান থানা এলাকার বিদ্যালয় গুলিকে নিয়ে বিদ্যালয় ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা করছি।২৬ বৎসর আগে নাট্য উৎসব এবং নাট্য প্রতিযোগিতা শুরু হলেও এই বৎসর নাট্য উৎসব ২৪ তম বর্ষ এবং নতুনভাবে নাট্য প্রতিযোগিতার ২ য় তম বর্ষ।নাট্য উৎসবের ২৪ তম বর্ষ তার কারণ করোনা কালীন সময়ে ২ বৎসর নাট্য উৎসব সংগঠিত করতে পারা যায় নি” । তিনি আরও বলেন, ” নবীন প্রজন্মকে মোবাইল থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে নাটকের যে জুড়ি নেই তা এই অনুষ্ঠানে না আসলে বোঝাই যেত না ” । বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব এর সভাপতি তথা সমাজসেবী গোপাল ঘোষ নাট্য উৎসব এবং নাট্য প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে বলেন, ” শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছিলেন ‘ থিয়েটারে লোকশিক্ষে হয় ‘। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নাটক, যাত্রাপালা, তরজা, কবিগান, বাউল, কীর্ত্তন, পালাগান, পল্লীগীতি,কেষ্টযাত্রা, রাসযাত্রা,ঘেঁটুগান ইত্যাদি সুস্থ সংস্কৃতির মাটির গান,মাটির সুর, মাটির সংস্কৃতি আজ কালের কপল জলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে।। তাই তার পুনরুদ্ধারের জন্য নাট্য চর্চা ও প্রসারে এই নাট্য প্রতিযোগিতা ও নাট্য উৎসবের আয়োজন ” । বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব এর কার্যকরী কমিটির সদস্য দীপঙ্কর ঘোষ নাট্য উৎসব এবং নাট্য প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে বলেন, ” আগে এখানে নাটক, যাত্রা – র চর্চা ছিল । এই চর্চা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। আগে নাট্য প্রতিযোগিতা ও নাট্য প্রদর্শনীর আয়োজন করা হত।২০ – ৩০ টি নাট্যদল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণ করতো। পরবর্তী সময়ে নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে নাট্য প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দিয়ে নাট্য প্রদর্শনীর উৎসব এর আয়োজন করা হচ্ছে।নাট্য প্রতিযোগিতা নয়,নাট্য প্রযোজনার মাধ্যমে নাট্য উৎসব করে চলেছি। গতানুগতিক ধারার যারা নাটক করে তাদের পাশাপাশি স্কুল ভিত্তিক ছাত্র -ছাত্রীদের মধ্যে কিভাবে এই চর্চা তাদের মধ্যে সঞ্চারিত করা যায় সেই চিন্তা ভাবনা করি আমরা সকলেই। শুধু পড়াশোনা নয়, শুধু বকাবকি নয়, তার সঙ্গে শিশু পড়ুয়াদের, ছাত্র -ছাত্রীদের একটা উম্মুক্ত খোলা আকাশের নীচে তাদের প্রতিভা গুলোকে মেলে সুযোগ করে দিতে পারে সুস্থ সংস্কৃতি – গান, আবৃত্তি, নাটক – যাত্রা।নীরস পড়াশোনা নয় – তার সঙ্গে সংস্কৃতির ও দরকার। তবে একটা সুস্থ স্বাভাবিক এবং সুন্দর সুশৃঙ্খল সমাজ তৈরি হতে পারে।২০২৫ সাল থেকে আমরা নাট্য উৎসবে কলকাতার নামী নাট্যদল গুলির নাট্য প্রদর্শন এর পাশাপাশি বাগনান এলাকার স্কুল গুলিকে নিয়ে স্কুল ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা করছি। মোবাইল এর সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট এর সহজলভ্যতা তার ফলে (অপসংস্কৃতির) বিনোদন আজ সকলের হাতে হাতে ।তারা নিজেদের প্রতিভা বিকাশে আগ্ৰহী নয়। থিয়েটার কে কখনই স্মার্ট ফোনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া যায় না। থিয়েটার একটা জীবন্ত শিল্প। বর্তমান প্রজন্মের শিশু – কিশোর, যুবক – যুবতীদের অপসংস্কৃতির জোয়ার থেকে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা , সুস্থ পরিবেশ, সুস্থ সমাজ তৈরি করা, সুস্থ মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য নাট্য প্রতিযোগিতায় তাদের সামিল করা হয়েছে।সুস্থ সংস্কৃতি,সীস্থ পরিবেশ, সুস্থ সমাজ, সুস্থ মানসিকতা তৈরির একমাত্র মাধ্যম নাটক, যাত্রা। আগামী প্রজন্মের মধ্যে যাতে এই মানসিকতা, এই নাট্য চর্চা গড়ে ওঠে সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ” । তিনি আনন্দের সঙ্গে বলেন, ” আগামী বৎসর এই নাট্য উৎসবের ‘ রজত জয়ন্তী বর্ষ ‘ উদযাপিত হবে। এই ‘ রজত জয়ন্তী বর্ষ ‘- এ আমরা কলকাতার নামী নাট্যদল গুলির নাট্য প্রদর্শন এর পাশাপাশি বাগনান এলাকার আরো অনেক স্কুল গুলিকে নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে আমন্ত্রণ জানাবো। এর পাশাপাশি বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব তাদের নিজস্ব প্রযোজনা বাঙালপুর তথা অন্যান্য পাশ্ববর্তী এলাকার দর্শকদের উপহার দেবে।বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব এর কলাকুশলীরা এখন থেকেই তাদের নিজস্ব প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য তার মহড়া শুরু করে দিয়েছেন। তিন দিন ব্যাপী নাট্য উৎসবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের নামকরা ছয়টি নাট্যদল প্রদর্শনীমূলক নাটক মঞ্চস্থ করেন। এর পাশাপাশি বাগনান এলাকার তিনটি হাই স্কুল নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতামূলক নাটক গুলি হল বাঙালপুর ইউ সি হাই স্কুল পরিবেশিত নাটক ” গৌ গাবৌ গাবঃ ” , মুগকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয় পরিবেশিত নাটক ” অর্থ স্বর্গ বিচিত্রা ” , ভুঁঞেড়া বি এন এস হাই স্কুল পরিবেশিত নাটক ” ইঁদারায় গন্ডগোল ” ।

প্রদশর্নীমূলক নাটক গুলি হল কালপুরুষ আগরপাড়া - র ” ভালবাসার মানুষ “, ইছাপুর আলেয়া – র ” নখ “, ইউনিট মালঞ্চ হালিশহর -র ” হজম শক্তি ” , বাগনান শপথ নাট্যগোষ্ঠী -র ” বৃষ্টিতে নিশিকান্ত ” , ময়না অন্যভাবনা – র ” ভৌতিক ” , রাধানগর দর্পণ – র ” চক্ষুদান “।বিদ্যালয় ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতায় ‘ কুহেলী বসু -র সৌজন্যে স্বর্গীয় সঞ্জিব চ্যাটার্জী স্মৃতি পুরস্কার প্রথম শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা ভুঁঞেড়া বি এন এস হাই স্কুল – নাটক ” ইঁদারায় গন্ডগোল ” । দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা বাঙালপুর ইউ সি হাই স্কুল – নাটক ‘”গৌ গাবৌ গাবঃ ” । তৃতীয় শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা মুগকল্যাণ হাই স্কুল – নাটক ” অথ স্বর্গ বিচিত্রা ” । শ্রেষ্ঠ নির্দেশক অর্নিবান রায়, নাটক ” ইঁদারায় গন্ডগোল “। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা সৌমদীপ সাউ, নাটক ” গৌ গাবৌ গাবঃ ” চরিত্র – সত্যনারায়ণ সিংহ। শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রাভিনেত্রী – শতাক্ষী চক্রবর্তী ” ইঁদারায় গন্ডগোল ” চরিত্র – নেত্য। তিন দিন ব্যাপী এই নাট্য উৎসব ও প্রতিযোগিতা এলাকায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতি প্রেমী বিদগ্ধজন বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব এর নাট্য উৎসবের পাশাপাশি স্কুল ভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা করার জন্য উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তাঁরা বলছেন,বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব প্রতি বৎসর এই ধরনের নাট্য প্রতিযোগিতা সংগঠিত করুক স্কুল গুলিকে সংগঠিত করে। এর পাশাপাশি এলাকার ক্লাব গুলিকে ও এই নাট্য উৎসব ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করুক।


Leave a Reply